সমুদ্র সৈকত
কক্সবাজারে দেশের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটায় আরেকটি সমুদ্র সৈকত রয়েছে যেখানে সূর্য ওঠা এবং সূর্যাস্ত দুইই দেখা যায়।
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং স্থাপত্য স্মৃতিস্তম্ভ দেশ জুড়ে অনেক ঐতিহাসিক জায়গা আছে যেগুলো পর্যটকগন পরিদর্শন এবং ইতিহাসের তথ্যান্বেষণ করতে পারেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থান হল পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি এবং খ্রিস্টীয় ৮ম থেকে ১০ম শতাব্দীর বৌদ্ধ যুগের ধ্বংসাবশেষ। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার উত্তরে নওগাঁ জেলায় অবস্থিত। এই সোমপুর বিহার হলো ভারতের প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম বৌদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি। পাহাড়পুরে হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ দেবতাদের মিশ্র নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় ইতিহাস প্রেমীরা বৃহত্তর বাংলার সেই সময়ের জীবন এবং সমাজ সম্পর্কে অন্বেষণ করতে এবং জানতে অগণিত ঘন্টা ব্যয় করতে পারেন।
বগুড়া শহরের কাছে মহাস্থানগড় এবং কুমিল্লার কাছে ময়নামতি হলো বৃহত্তর বাংলা এবং বর্তমান বাংলাদেশের বৌদ্ধ সভ্যতার দুটি ধ্বংসাবশেষ যা ঐতিহাসিকদের কাছে স্বর্গ বলে বিবেচিত। সুন্দর পোড়ামাটির সজ্জিত কান্তজির মন্দিরটি ১৭৫২ সালে নির্মিত। সারাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বা জেলা অঞ্চলে অন্যান্য অনেক পুরানো হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরের সাথে এটি নির্মিত হয়েছিল। লালবাগ কেল্লা ঢাকার একটি আকর্ষণ যা ১৬৭৮ সালে মুঘল আমলে শায়েস্তা খান কতৃক নির্মিত হয়েছিল।
পুরাতন শহর সোনারগাঁও ঢাকার কাছাকাছি যা ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে তার গৌরবময় সময়কালের বিকাশ ঘটায় যখন এটি ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলার প্রথম দিকের স্বাধীন রাজ্যের রাজধানী হিসাবে আবির্ভূত হয়। আধুনিক শহরের মতো অনেক পুরানো স্থানের ধ্বংসাবশেষ, আলংকারিক বাসস্থান, সুসজ্য বাগান এবং সুনির্মিত রাস্তা এখনও এখানে পাওয়া যায়। এখানে একটি লোকশিল্প জাদুঘর রয়েছে যা একই সময়ে পরিদর্শন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে অনেক নতুন স্থাপত্য নিদর্শন এবং আধুনিক ভবন রয়েছে যা নির্মিত হয়েছে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক সময়ে। এর মধ্যে কিছু স্থাপনা বড় শহরের কাছাকাছি। সাভারের কাছে স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ, মুজিবনগর স্বাধীনতা স্মৃতি কমপ্লেক্স যেখানে বাংলাদেশের প্রথম সরকার ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের কাছে শপথ নিয়েছিল। গোপালগঞ্জের কাছে টুঙ্গিপাড়ায় নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সমাধিক্ষেত্র, জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, এবং ঢাকার পুরোনো ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল, অনেক পর্যটককে আকর্ষণ করবে। শিলাইদহে ১৯১৩ সালে ভারতের প্রথম নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজবাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ার কাছেই একজন বাঙালি মরমী সাধক, গীতিকার, শিল্পী লালন ফকিরের মাজার রয়েছে যিনি বহুসংস্কৃতির দর্শন প্রচার করেছিলেন এবং হিন্দু, মুসলিম এবং লোকসাহিত্যের মিশ্রণে ১৮ শতকে মানবতাবাদী বাউল ধর্মের প্রচারে অনেক ভক্তিমূলক গান রচনা করেছিলেন।
রাজধানী ঢাকা সহ বাংলাদেশে অনেক বড় জনবহুল শহর রয়েছে। ঢাকা শহরে প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, জাদুঘর, পুরানো স্থাপত্য স্থাপনা নিয়ে ১৬ শতক থেকে পুরানো বৃহত্তর বাংলার রাজধানী। এখানে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার। ব্রিটিশ শাসনামলে, বর্তমান বাংলাদেশ এবং বৃহত্তর প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানার জন্য শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর একটু সময় নিয়ে দেখা বাংলাদেশ তথা এ অন্চল সম্পর্কে একটি ভালো ধারনার সূচনা হবে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর শহর চট্টগ্রামের চারপাশে পাহাড়, বন এবং সমুদ্র সৈকত সহ অনেক প্রাকৃতিক আকর্ষণ রয়েছে। এটি বিমান, ট্রেন এবং সড়ক পরিবহনে পৌঁছানো যেতে পারে। যদিও ঢাকা থেকে ট্রেনে ভ্রমন করলে, রেললাইনের ধারে ধারে বাংলার মনোরম গ্রামীণ দৃশ্যাবলী উপভোগ করা সুযোগ পাওয়া যাবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে আগমনকারী পীর শাহ আমানতের মাজার অনেক মুসলিম ভক্তদের জন্য একটি আকর্ষণ।
উত্তরে রাজশাহী হল বর্ষাকালের প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে শাহ মখদুমের মাজার রয়েছে। তিনি ১৪ শতকের একজন মুসলিম আধ্যাত্মিক সাধক, যিনি এই অঞ্চল ও এখানকার চারপাশে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন।
খুলনা দ্বিতীয় বন্দর শহর এবং সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। কাছাকাছি বাগেরহাটে একটি ষাট গম্বুজ মসজিদ রয়েছে যেখানে খান জাহান আলী, আরেকজন বিখ্যাত মুসলিম সাধক, যিনি সুন্দরবন এলাকার ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে মানব বসতি স্থাপন করেছিলেন।
সিলেটে মালনীছড়াসহ অনেক সবুজ চা বাগান রয়েছে, যা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম চা বাগান। এখানে শাহ জালালের মাজার অবস্থিত, যিনি ১৩ শতকে বাংলার সবচেয়ে বিশিষ্ট মুসলিম সাধক ছিলেন।
পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণে দেশ জুড়ে অনেক ছোট শহর এবং শহরতলী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির পার্বত্য জেলা এবং দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ যা ১০০০ মিটারের বেশি উচুঁ। চিরহরিৎ বৃষ্টিভেজা অরন্য এখানে রয়েছে।
উত্তর-পূর্বে শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ গারো পাহাড়সারিতে পর্ণমোচী শাল বৃক্ষের বনান্চল আছে। বন্য হাতিরা মাঝে মাঝে বনে, ফসলক্ষেতে ও লোকালয়ে চলে আসে। সেখানে সড়কপথে সহজেই বেড়াতে যাওয়া যেতে পারে।
নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় থেকে উৎপন্ন শক্তিশালী ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা এবং ধরলা নদীগুলির বিধৌত সমতল প্লাবনভূমি, বিশাল বিস্তৃত বালির চরগুলি উত্তরবঙ্গে রংপুর ও দিনাজপুরকে ভ্রমন করতে বিশেষভাবে আকর্ষন করে। এই নদীগুলিতে ইন্জিনচালিত নৌকাভ্রমন, দু তীরের মানুষদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা, গ্রাম্য বালক বালিকাদের নদীর পানিতে সাতাঁর বা ঝাঁপাঝাঁপির দৃশ্য অন্য কোনো ভাবে দর্শন সম্ভব নয়। যে কোনও এডভেন্চারপ্রিয় ভ্রমণকারীর জন্য তা অমূল্য স্মৃতি হতে পারে।
বাংলাদেশ যে কোন ধরনের পর্যটকগনের জন্য আকর্ষনীয় পসরা তাদের আস্বাদনের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছে। বাংলাদেশ ভ্রমন করুন। এই রোমান্চকর দেশে আপনাকে স্বাগতম। আপনার ভ্রমন নিরাপদ ও আনন্দময় হোক।
আমার মতে শীর্ষ পাঁচ
- রাজধানী ঢাকা এবং বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চল
- খুলনা ও সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বন
- কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ
- মুজিবনগর স্বাধীনতা যুদ্ধ কমপ্লেক্স, আমঝুপি নীলকুঠি (মেহেরপুর)
- প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলি যেমন বগুড়ার মহাস্থানগড় ও উত্তরবঙ্গের পাহাড়পুর।