এক টুকরো মেঘ ছুটতে ছুটতে চলে গেল আফ্রিকান সাভানার উপর দিয়ে। নাইরোবির উইলসন এয়ারপোর্ট থেকে মাসাই মারার কিকোরোক এয়ারস্ট্রিপ। আকাশপথে মিনিট পঞ্চাশেক। ছোট্ট বিমান, পথে কয়েকটা এয়ারস্ট্রিপে যাত্রী নামাবে, তুলবে। অনেকটা আকাশপথে লোকাল বাসের ছোঁয়া।আমারটা দ্বিতীয় স্টেশন। যাত্রার আগে অবশ্য ফ্লাইট শিডিউল নিয়ে কম নাটক হয়নি। ওলকিয়োম্বো এয়ারস্ট্রিপ বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত, শিডিউল এই এগোয়, এই পেছায়। ভোরের আলো ফুটবো ফুটবো করি সময়ে শেষ পর্যন্ত সব ঝামেলা চুকিয়ে এয়ার কেনিয়ার ড্যাশ এইটে কায়দা করে একটা জানালার পাশের সিট দখল করে বসলাম।
 
ছোটবেলায় কবে প্রথম টিভিতে গ্রেট মাইগ্রেশন দেখেছিলাম মনে নেই। শুধু মনে আছে বিশাল এক বন‍্যপ্রানীর পাল মারা নদী পার হচ্ছে, কোনটা কুমিরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কোনটা নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, কোনটা কোনরকম ল‍্যাংচাতে ল‍্যাংচাতে পারে উঠে আসছে। ন‍্যাশনাল জিওগ্রাফির কোন ডকুমেন্টারি হবে। সাভানার চোখ ধাঁধানো বিস্তীর্ন তৃনভূমি, দুর্ধর্ষ চিতার হরিন শিকার, হাতির পাল বা সিংহের প্রাইড সব কিছু মিলে এই মাসাই মারা নামটা মাথার মধ‍্যে গেথেঁ গিয়েছিল। অনেকের হয়তো সেটা সেরেঙ্গিটি। তবে যাই হোক, এই দুটো যায়গা মিলেই (তাঞ্জানিয়ার সেরেনগেটি ন্যাশনাল পার্ক এবং কেনিয়ার মাসাই মারা ন্যাশনাল রিজার্ভ) এক বিশাল বৃত্তাকার পথে প্রানের তাগিদে আবর্তিত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন‍্যপ্রানী পরিব্রাজন- দ‍্য গ্রেট মাইগ্রেশন।
অনেক পরিকল্পনা-প্রস্তুতি নিয়ে, বহুক্রোশ পেড়িয়ে, অনেক কষ্ট করে এসেছি এই মাসাই মারা দেখতে। সেই ঘোরের মধ্যেই জানালার পাশে ওই ছুটন্ত মেঘটা যেন বলে গেলো, এই যে, এসে গেছেন। এবার বুঝে নেন, কি করবেন!
 
কিকোরোক এয়ারস্ট্রিপে নেমে মোবাইল বের করে দেখি-নেটওয়ার্ক নেই। হোটেলে ফোন দেব ভেবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, এমন সময় দুই প্রস্হ লাল কাপড়ে মোড়া আর দুগাল হাসিতে ভরা এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, মারা লেইজার ক্যাম্প? লোকটাকে দেখে ড্রাইভার মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং মনে হলো, স্হানীয় কোনো অনুষ্ঠান থেকে নাচানাচি করে উঠে এসেছেন। কোন জুতসই পর্যটক খদ্দের খুঁজছেন।
 
আমি বললাম, তুমি আমাকে মারা লেইজারে নিয়ে যাবে? লোকটা হাসি আর দাঁতের ভাষায় যেন জোড়ালো সম্মতি জানালো। নাম ড্যান। জিজ্ঞেস করল পার্কের টিকিট কিনেছি কিনা। না কিনে থাকলে কিনে নিতে হবে। চারপাশে মানুষজন খুব কম। তিন-চারটা ছোট বিমান হুটহাট নামছে, আবার ধুলো উড়িয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে। টিকিট কেটে, একটু ফ্রেশ হয়ে ড্যানের সাত সিটের জিপে উঠে বসলাম।
 
জিপ দেখে অবশ্য প্রথমেই একটু হতাশ হলাম। ছবিতে যে সাফারি জিপ দেখি, চারদিকে প্রটেকশন, মাথার ছাদ খুলে দাঁড়িয়ে সিংহ দেখার ব্যবস্থা, এ গাড়িতে সেসব কিছুই নেই। চারদিক খোলা।নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। এটা নিশ্চয়ই শুধু হোটেল পিক-আপের গাড়ি। সিংহ দেখার গাড়ি আলাদা হবে।
 
ড্যান আসলে একজন মাসাই। পূর্ব আফ্রিকার এই বিখ্যাত নাইলোটিক (নীল নদের পারের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর) জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষেরা কয়েক শতাব্দী আগে উত্তর দিক থেকে (বর্তমান সুদান ও ইথিওপিয়া) দক্ষিণে নেমে এসে কেনিয়া-তাঞ্জানিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে বসতি গড়েছিল। এরা চাষবাসে অভ‍্যস্ত নয়। মূলত গবাদিপশু লালনপালন করে জীবনযাপন করে। যাই হোক, আপাতত গাড়ি চলেছে, আর আমি জানালা দিয়ে মাসাই মারা গিলছি। 

মাসাই মারা নামের মানে জিজ্ঞেস করেছিলাম ড‍্যানকে। এটা নাকি মাসাইদের পূর্ব পুরুষদের দেয়া নাম। ইংরেজিতে, স্পটেড ল‍্যান্ড। মাসাইরা এসে দেখে বিস্তীর্ন তৃনভুমির উপর ছোপ ছোপ কাল দাগের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে। সেখান থেকেই এমন নামকরণ।

অল্প কিছুদূর যেতেই জেব্রার পালের দেখা গেলো। তার সঙ্গে হরিণের মতো কত রকম প্রাণী! আমার প্রাণিবিদ্যার দৌড় তখনো জেব্রা পর্যন্তই। বাকিদের পরিচয় বই পত্রে দেখলেও, ভালভাবে শিখেছি ড্যানের কাছে। ওয়াইল্ডবিস্ট, গ্রান্টস গেজেল, থমসনস গেজেল, ইল্যান্ড, ওয়াটারবাক, রিডবাক, ইম্পালা। এক নাম মুখস্থ করতে করতেই আরেক প্রজাতি হাজির।

প্রথম যাত্রা সবই চমৎকার চলছিল। তবে, পুরোটাই মাটি আর পাথরের কাঁচা পথ। ডিজেল ইঞ্জিনের বিকট শব্দ। সাত সিটের গাড়িতে যাত্রী আমি একা। এক ঝাঁকুনিতে ডানে, তো পরেরটায় বাঁয়ে। ঠিক যখন ভাবছি, এভাবে আর কত দূর? ড্যান হঠাৎ গাড়ি থামাল।

ডানদিকে ঘাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একদল হায়না।আমার যাবতীয় প্রকৃতিপ্রেম মুহূর্তে উবে গেল। এমনিতেই চারপাশে কোন প্রটেকশন নেই! সিটের অন্য পাশে সরে গেলাম।

ওরা অ্যাটাক করবে না তো? ড্যান নির্বিকার।

হায়নাগুলো গাড়ির পেছনে চলে গেল। একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি, এমন সময় দেখি একটা হায়না বাঁ পাশে, প্রায় হাতের নাগালে! আমি আঁতকে ওঠার আগেই ড্যান ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। শব্দে হায়নাটা সরে গেল। কিছুদূর গিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ওরা সত্যিই আক্রমণ করে না? ড্যান মাথা নাড়ল। আবার জিজ্ঞেস করলাম। আবার মাথা নাড়ল। তৃতীয়বারও একই উত্তর। কিন্তু আমার বিশ্বাস হলো না। মনে মনে ভাবলাম, শালা ব্যবসার জন্য আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি! 

কিছুদূর পর লম্বা ঘাসের মাথার ফাঁকে দেখলাম দুই-তিনটা বিশাল কালো শরীর। মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। চলন্ত গাড়ি থেকে এই দেখা যায়, এই হারিয়ে যায়। ড্যান বললো, আফ্রিকান কেপ বাফেলো। বয়স্ক পুরুষ কেপ বাফেলো অনেক সময় পাল থেকে আলাদা হয়ে ছোট দলে থাকে, কখনো একেবারে একাও হয়ে যায়। এবং একা একাই মারা যায়। কথাটা শুনে কেমন যেন লাগল। সারাজীবন দল, প্রতিযোগিতা, শক্তি। আর তারপর বয়স হলে ধীরে ধীরে দল থেকে দূরে সরে যাওয়া। শেষ বয়সে একা ঘাস খাওয়া। মানুষের সঙ্গে খুব বেশি তফাৎ আছে কি? 

বেশিক্ষণ লাগলো না। গাড়ির পরের ঝাঁকুনিতেই দর্শন উড়ে গেল, তার জায়গায় ঢুকল ধুলো। প্রচুর ধুলো। শার্টের আস্তিন দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে কোনোমতে চলছি।

হঠাৎ খেয়াল করলাম, ড্যানের মধ্যে অস্বাভাবিক চাঞ্চল্য। গাড়ি কখনো এদিকে নিচ্ছে, কখনো ওদিকে। ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে। আমি জিজ্ঞেস করলে কিছু বলে না। আমার সন্দেহ হলো, ব্যাটা রাস্তা হারিয়েছে। একসময় আরেকটা সাফারি গাড়ি পেয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে দুটো কথা বলেই আবার গাড়ি জোরে টানা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর দেখি, বেশ কয়েকটা গাড়ি সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে। সবাই চুপচাপ একদিকে তাকিয়ে আছে। কারও কারও হাতে বাইনোকুলার। আমিও আমার ১০×৪২ নাইকন প্রেস্টাফে চোখে লাগালাম।প্রথমে কিছুই দেখি না।

শুধু ঘাস
আরও ঘাস
তারপর
একটা মাথা
তার চারপাশে বিশাল কেশর। সিংহ!

আরও ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম, সে একা নয়। আশপাশে কয়েকটা সিংহী। কেউ মাথা তুলছে, কেউ ঘাসের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে, কেউ আবার এমনভাবে শুয়ে আছে যেন পৃথিবীর বাদবাকি প্রাণীদের অস্তিত্বে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ড্যান আমার দিকে তাকিয়ে মুখমন্ডলের প্রায় সকল দাঁত বের করে হাসল।

-হ্যাপি?

আমি তখন আর কী বলি! গেম ড্রাইভ এখনো শুরুও হয়নি, তার আগেই সিংহ! ড্যানের উপর আমার আস্থার সূচক এবার ঊর্ধ্বমুখী। হায়নার ঘটনাও সাময়িকভাবে ক্ষমা করে দিলাম।এরপর আর বেশি থামেনি ড্যান। দূরে উটপাখি দেখলাম, জিরাফ দেখলাম, ওয়ার্থগ দেখলাম। তারপর সোজা মারা লেইজার ক্যাম্প।আর সেখানে পৌঁছে আমার দ্বিতীয় বিস্ময়।মাসাই মারার ঠিক মাঝখানে, তালেক নদীর এক অশ্বখুরাকৃতির বাঁকের ভেতর গাছপালায় ঢাকা নির্জন এক নিসর্গ। মারা লেইজার ক্যাম্প।ছবিতে যতটা ভেবেছিলাম, বাস্তবে তার চেয়েও সুন্দর।দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিটা যেন ক্যাম্পে পা দিয়েই একসঙ্গে জেতে বসলো। চেক-ইন করলাম, বিকেলের গেম ড্রাইভ ঠিক করলাম, একটা ককটেল অর্ডার দিয়ে কটেজে উঠে গেলাম।

তারপর নিজের কপালকে একটু সাধুবাদ দিলাম।ঠিক এমনটাই তো চেয়েছিলাম। কটেজের সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ছোট্ট তালেক নদী। ওপারে গাছ আর ঝোপের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক টুকরো মাসাই মারা। চারদিকে নাম না জানা পাখিদের কিচির মিচির, বাতাসে পাতার অবিরাম ঝিরঝির, আর বয়ে চলা কুলকুল নদী যেন দূরের অন্তহীন সাভানার সাথে মিলে মিশে একাকার! বারান্দায় বসে একবার মনে হলো, স্বপ্ন পূরণ হলে কি স্বপ্নের মৃত্যু হয়?

কই? আমার তো মাসাই মারা তখন সবে শুরু মাত্র! 

পড়ুন মহসিন হাওলাদাররের আরো লেখা 

 

ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের সকল কর্মকান্ড নট ফর প্রফিট, স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণে সকল কাজ পরিচালিত হচ্ছে।

অত্যন্ত ভরাক্রান্ত মনে জানাতে হচ্ছে যে আমাদের সম্মানিত লেখকদের জন্য কোনো তহবিল এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। অদূর ভবিষ্যতে তহবিল গঠন করতে পারা গেল এই অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।

 

বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবক এবং স্ব-অর্থায়নের উপর নির্ভর করে। আপনারা ঘুরুঞ্চিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে, অনুদান দিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারেন।

ঘুরুঞ্চির ভ্রমণ ছবি ব্লগের ছবি থেকে আপনার পছন্দসই ছবি পেপার প্রিন্ট, ফাইন আর্ট প্রিন্ট, ওয়াল আর্ট এবং ডেস্ক আর্ট হিসাবে কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনারা ছবি কেনাকাটা করলে আমরা অল্প পরিমাণ কমিশন পাব, যা ঘুরুঞ্চির ক্রমবিকাশ এবং সম্প্রসারে ব্যাবস্থার হবে, যা ঘুরুঞ্চির ক্রমবিকাশ এবং সম্প্রসারে ব্যবহার হবে।

আমরা আপনার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ।